স্কাই ডাইভিং – নিউজিল্যান্ড ট্যুর

এই ব্লগটি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। আমার অনেক দিনের স্বপ্ন ছিল স্কাই ডাইভিং করার। পুরো লেখাটিতে স্কাইডাভিং-এর খুঁটিনাটি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমার মতো আরো অনেকে যারা স্কাই ডাইভিংয়ে আগ্রহী, তাদের কাজে আসবে বলে আশা করি।

কস্টিউম পড়ে আমি যখন প্রস্তুত!

 

আমার হাইটফোবিয়া আছে। আমি সবসময় উঁচু জায়গা ভয় পেতাম,সত্যি বলতে এখনো পাই। কিন্তু ওপর থেকে যেকোন কিছু দেখার আগ্রহ আমার সবসময়ের। বিমানে জানালার পাশের সিটটি আমার সবসময়ই পছন্দের। মাঝে মাঝে মনে হয় যদি আমার সিটের নিচের লাইফ জ্যাকেট নিয়ে সমুদ্রে লাফ দেওয়া যেতো তাহলে কী হতো! সৌভাগ্যক্রমে,স্কাই ডাইভিং করে ফেলেছি, এখন এসব নিরির্থক চিন্তা আর মাথায় আসে না।

আমার পরিকল্পনা ছিল নিউজিল্যান্ড ঘোরার এবং সেখানে স্কাই ডাইভিং করার।(এমন কি নিউজিল্যান্ড ফ্লাইটের টিকেট বুক করার আগেই আমি স্কাই ডাইভিং এর টিকেট বুক করি)। তখন ছিল ডিসেম্বর মাস, রৌদ্রোজ্জ্বল দিন। ডাইভিং এর জন্য এটা উপযুক্ত সময়। সময়মতো পৌঁছে গেলাম “এনজোন স্কাইডাইভ কুইন্সটাউইন”,নিউজল্যান্ড এ। ওখানের স্টাফরা জানালো- নিউজিল্যান্ড নাকি পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর স্কাই ডাইভ প্লেস। একসাথে পাহাড়,লেক এবং অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের মধ্যে ডাইভ করার মতো যায়গা নাকি খবই কম!

ডাইভিং এর আগে আমাকে অনেকগুলো সাইন করতে হয়েছে যেখানে উল্লেখ ছিল যদি আমার কোন দুর্ঘটনা ঘটে (আহত/ মৃত্যু) তাহলে কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমারা চলে গেলাম স্পটে। যেতে যেতে আমি কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়ছিলাম। আমার হৃদপিণ্ড ধুকপুক করছিল, হাতের তালু ক্রমাগত ঘামছিল। তবুও আমি মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম,আমার শরীর যেন এই ধকল নিতে পারে।

ওই যে দেখা যায় আমার বিমান!

 

আমরা সময়ের আগেই ডাইভিং পয়েন্টে চলে গেছিলাম,কেননা আমি তখন অতিমাত্রায় উত্তেজিত এবং ভীত ছিলাম। কিন্তু মনোরম লেক আর সবুজ ওকের বাগান দেখার পর আমার মনে হচ্ছিল এর সাথে যেন রয়েছে আমার আত্মার টান। শুধু এই জন্য আমার ভয় কে দূরে রেখে ডাইভের আগে নিজের কতগুলো ছবি তুললাম, যেন নিজেকে চাঙ্গা রাখতে পারি। আমি হাসিখুশি ভাবে ছবি তুলতে লাগলাম,এবং ভাবতে লাগলাম এটাই বুঝি আমার জীবনের শেষ দিন।

আমি এবং আমার ইন্সট্রাক্টর মিয়া
আমি এবং আমার ইন্সট্রাক্টর ”মিয়া”

অবশেষে ডাইভ এর জন্য প্রস্তুতি নিলাম।আমার ইন্সট্রাক্টর মিয়া, আমাকে জাম্পসুট এবং জুতা দিলো পড়ে নেবার জন্য। হঠাত করে পেটের মধ্যে অদ্ভুত মোচড়ানো অনুভব করলাম। ডাইভিং সুট পরে নেবার পর ইন্সট্রাক্টর মিয়া আমার ইন্টারভিউ নিলো এবং আবার আমাকে ডাইভ সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দিতে লাগলো,আমি কোন পজিসন এ থাকবো, ৩ থেকে গননা শুরু হলে কিভাবে লাফ দিবো প্লেন থেকে এসব আমাকে বুঝিয়ে দিলো। সে এমনভাবে কথা বলতে লাগলো যেন আমারা পুরাতন বন্ধু- পার্কে হেটে হেটে গল্প করছি!

যদিও নার্ভাস ছিলাম, পোজ দিতে ভুলি নাই!

আমরা প্লেনে এ উঠলাম এবং প্লেনটিতে আমরা ৮ জন সহ একজন পাইলট ছিলেন, একটি অদ্ভুত অনুভুতি কাজ করছিলো আমার মধ্যে। আমার ইন্সট্রাক্টর তাঁর সাথে আমাকে বেঁধে নিলেন এবং বুঝাতে লাগলেন, “আমার সাথে কেউ একজন আছে,আমার জন্য সে আছেন।“ যখন প্লেন ওড়া শুরু করলো তখন সব কিছু অবাস্তব মনে হচ্ছিলো। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম, নিচের সব কিছু ছোট হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আমার ১২,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে লাফ দেওার কথা থাকলেও, কিছু সমস্যার জন্য আমাকে ১৬,০০০ ফিট উচ্চতা থেকে লাফ দিতে হয়। তখন আমি একাধারে উচ্ছসিত এবং আতঙ্কিত। যখন লাফ দেয়ার মুহূর্ত আসলো, তখন আমি ভাবছিলাম আমার ইন্সট্রাক্টর কে বলবো, আমি লাফ দিবো না,আমি প্লেনেই থাকি, পাইলট এর সাথে নিচে নেমে যাবো। কিন্তু আবার নিজেকে বুঝালাম,কিছুতেই পিছু হটা যাবে না।

 

“ অনেক মানুষ মনে করে যে স্কাই ডাইভিং এর সময় তাঁরা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। আদতে সেরকম কিছু হয় না। স্কাইডাইভিং এর ভয়টা আসে অজানা এক অভিজ্ঞতা নেবার ভয় থেকে। অবশ্যই স্কাইডাইভিং বেশ ভয়ংকর একটি বিষয়। তবে এর রিস্কগুলো বেশ ম্যানেজ করার মত এবং এখান থেকে দারুন উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতা পাওয়া সম্ভব।” – প্রাচী।

 

 

অবশেষে সেই কাংখিত মুহূর্ত!

 

যখন প্লেন এর দরজা খুলল, লাফ দেয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে আমার সব কিছু কেমন যেন অবশ হয়ে যাচ্ছিল। যখন আমরা লাফ দিবো তখন মনে হচ্ছিলো,আমার পা কাজ করছিলো না। হৃৎপিণ্ড যেন পাগলা ঘোড়ার মতো লাফাচ্ছে। যখনি লাফ দিলাম তখন সকল ভয় উচ্ছ্বাস এ পরিনত হল।আমার মনে হচ্ছিলো না আমি নীচে পড়ে যাচ্ছি, বুঝতেও পারছিলাম না ঠিক কত গতিতে আমরা নিচে পড়ছি। ভয়ের মুহূর্ত শেষ করে যখন আসে পাশে তাকালাম তখন শুধু সুন্দর লেক আর পাহাড়! মনে হচ্ছিলো গোটা পৃথিবী আমার নিচে।

উড়ছি!

আমরা ৬০ সেকেন্ড এর মতো মুক্ত ভাবে উড়ছিলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিলো যেন ১০ সেকেন্ড। অবশেষে সময় আসলো, আমি অনুভব করলাম,আমি শ্বাস নিতে পারছি না,বিষ্ময়ে চিৎকার দিতেও ভুলে গেছি। এখন পর্যন্ত এটাই আমার সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা।

ততক্ষনে সাহস অনেকটাই ফিরে পেয়েছি 😀

যখন মিয়া প্যারাসুটটি খুলল, অনেক ঝাকি অনুভব করলাম,সেইসাথে স্বস্তিও। আমি সত্যি আনন্দ পেয়েছি পাখির চোখে অপার্থিব সৌন্দর্য দেখে। হুটহাট মুখে ঠাণ্ডা বাতাস অনুভব করছিলাম। আমরা বাতাসে ২-১ মিনিট গোত্তা খেলাম। এরপর মিয়া আর আমি যখন নামলাম তখন আমার মুখ থেকে একটাই কথা বের হল” ওয়াও! আমি জীবিত আছি!”

বিশ্বাসই হচ্ছে না আমি জীবিত ফিরে এসেছি!

আমি কোথাও পড়েছিলাম, যেকোন বোকাই হয়তো বিমান চালাতে পারবে, কিন্তু বিমান থেকে লাফ দেয়ার জন্য অনেক বিশেষ ধরনের বোকার প্রয়োজন। আমার মনে হয় জীবনে অন্তত একবার আমাদের সবারই এরকম বোকা হওয়া প্রয়োজন। আমি অত্যন্ত আনন্দিত এই ভেবে যে আমার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন আমি অবশেষে পূরণ করতে পেড়েছি। আমি আমৃত্যু এই অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখব। আশা করব আমার এই অভিজ্ঞতা আপনাদের সবাইকে নিজ নিজ স্বপ্ন পুরনের ব্যাপারে উৎসাহিত করবে।

আমি অনেক খুশি ,আমি আমার ভয় কে জয় করতে পেরেছি। এটা একটা অসাধারণ অভিজ্ঞতা যা আমি আমার মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবো। আশা করি, আপনারাও আপানদের স্বপ্ন সবসময় অনুসরন করবেন।

আমার এই অভিজ্ঞতা পরে কি আপনিও উত্তেজনা অনুভব করছেন? এরকম অভিজ্ঞতা নিতে চান? তাহলে আজি বেড়িয়ে পড়ুন ভ্রমনে। সারা পৃথিবীর সব গন্তব্যের ফ্লাইট ও হোটেল সম্পর্কে জানতে হলে আজই আমাদের সাথে ফোন করুনঃ +88-09617-111-888 or অথবা ইমেইল করুনঃ sales@flightexpert.com

 

মুল রচনাঃ প্রাচী দোশি মিত্তাল  (ভারত)

অনুবাদঃ আব্দুল্লাহ আল ইমরান (বাংলাদেশ)

 

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দুর্গা পুজায় ভারত ভ্রমণ । কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লী, পাটনা, বেনারস
Previous post
Skydiving – Face the Fear
Next post
Reviewed by 46 People. - Rated: 4.0 / 5.0