fbpx

করোনা ভাইরাস আতঙ্কঃ মানসিক চাপের লক্ষণ ও প্রতিকার সমূহ

করোনা ভাইরাস সমস্যায় মুষড়ে পড়েছে গোটা দুনিয়া। চারিদিকে শুধু শোক সংবাদ আর অসুস্থতার খবর। নিজেদের কাজ ও অভ্যাসগুলোকে বন্ধ রেখে ঘর বন্দি হতে হয়েছে মানুষকে। এমন অবস্থায় যদি বলেন যে আপনি মানসিক চাপে আক্রান্ত, তাহলে অবাক হব না। কারণ আপনি একা নন। এই সমস্যার ভিতর দিয়ে কম বেশী যাচ্ছি আমরা সবাই।

 

মানসিক চাপ বা মেন্টাল স্ট্রেস এর লক্ষন সমুহ

বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বেশ কিছু লক্ষন যেমন হার্ট বিট বেড়ে যাওয়া, বেশি ঘাম হওয়া, পেশীতে টেনশন অনুভব করা, গলায় শক্ত ভাব অনুভুত হওয়া ইত্যাদি লক্ষনের মাধ্যমে নিজেদের মানসিক চাপ বা মেন্টাল স্ট্রেস হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত হতে পারেন। সাধারণত এই লক্ষন গুলো থেকেই বুঝা যায় যে কেউ মানসিক চাপে আছেন কিনা।

তবে আরো কিছু লক্ষন আছে, যেগুলো মানসিক চাপের অস্তিত্ব প্রমান করে। ক্লিনিকাল সাইকোলোজিস্ট এমেলিয়া আলডাও এর মতে, মনোযোগ দিতে না পারা, মেজাজ খিট খিটে থাকা, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, ঘুমে ব্যাঘাত ঘটা এবং ব্যাক্তিগত সম্পর্কের অবনতিও মানসিক চাপের লক্ষন বলে বিবেচিত হতে পারে।

এখন এরকম কিছু লক্ষণ এবং তাদের সাম্ভাব্য প্রতিকার নিয়ে সংক্ষেপে বলছি।

নিদ্রাহীনতা

মানসিক চাপের অন্যতম লক্ষন হল ঘুম কম হওয়া। ঘুম কমে যাওয়া সহ বিভিন্ন সমস্যা যেমন ঘুম না আসা, মাঝ রাতে ঘুম ভেংগে যাওয়া এবং আবার ঘুমিয়ে পড়তে সমস্যা হওয়া ইতাদি সমস্যা তখন বেশ প্রকট হয়ে ওঠে। এই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রাতে ঘুম ভাংলে মহামারী সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যাপার মাথায় ঘোরাঘুরি করতে থাকে। ফলে ব্লাড প্রেশার বেড়ে যায়, হার্ট বিটও বেড়ে যায়। ফলে আবার ঘুমিয়ে পড়া কঠিন হয়ে যায়।

প্রতিকার

এই সমস্যা দুর করতে রুটিন মাফিক জীবন যাপন করতে হবে। বিশিষ্ট নিউরোলজিস্ট ব্র‍্যান্ডন পিটারস এর মতে, প্রতিদিন এক সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস, কম ক্যাফেইন খাওয়া, কম এলকোহল সেবন, শরীর চর্চা, দিনের বেলা কিছু সময় রোদে থাকা, ইত্যাদি অভ্যাস নিদ্রাহীনতা তথা ইনসোমনিয়া থেকে আপনাকে মুক্তি দিতে পারে। এছাড়া শোবার ঘরকে ঠান্ডা এবং অন্ধকার রাখাটা ঘুমের জন্য ভাল হবে। ডিভাইসের ব্যাবহার সিমীত রাখতে হবে। শোবার আগে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খেলে ঘুম ভাল হবে।

 

 

কাজে মনোযোগের অভাব বোধ করা 

মানসিক চাপে যারা ভোগেন তাদের পক্ষে কোন কাজে মনোযোগ দেয়া বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। মানুষ স্বভাবগত ভাবে তার উপর আসা কোন হুমকির উপর সাধারণত বেশী মনোযোগী হয়। যেহেতু এখন Covid 19 এর সংক্রমণ আমাদের জীবন, জিবীকা এবং শরীরের উপর হুমকি স্বরূপ, তাই স্বাবাভিকভাবেই আমাদের মস্তিষ্কও এই ভাইরাস এবং তা থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার চিন্তায় ব্যস্ত। আপাততঃ এই ভাইরাসের ভাল কোন প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যাবস্থা না থাকায় এই চিন্তাগুলো মানসিক চাপ তৈরী করছে।

নর্থ ক্যারোলিনা ইউনিভার্সিটির ক্লিনিকাল সাইকোলজি বিভাগের প্রফেসর জোনাথন আব্রাহামোভিচের মতে, এখন আমদের হোম অফিস, হোম স্কুলিং, অনলাইন মিটিং, ভার্চুয়াল প্রেজেন্স এর মত কাজগুলো করতে হচ্ছে যেখানে এক্সট্রা মনোযোগের দরকার। কিন্তু আমাদের মস্তিস্ক এখন করোনা ভাইরাস নিয়ে দুশ্চিন্তায় ব্যাস্ত। তাই তার পক্ষে এই কাজ গুলোতে মনোযোগ দেয়া মুশকিল হয়ে পড়ছে।

প্রতিকার

এই অবস্থার উন্নতি করতে দরকার কাজের পরিমান কমানো। একান্ত প্রয়োজনীয় কাজ গুলো করা ছাড়া বাড়তি কাজ এড়িয়ে চলতে হবে। পরবর্তী দিনের কাজগুলোর লিস্ট আগের দিন বিকালের মধ্যে তৈরি করে রাখলে ভাল হয়। কাজের মধ্যে প্রতি ৪৫ মিনিট পর ব্রেক নিতে হবে। সবচাইতে বড় ব্যাপার হল, নিজের প্রতি সদয় হতে হবে। এটা মেনে নিতে হবে যে এই সংকটের সময় কাজের দক্ষতা আগের মত থাকবে না এবং এটাই স্বাভাবিক।

 

স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়া

যেকোন দরকারী তথ্য বা স্মৃতি ভুলে যাওয়া এই সময়ের আরেকটি সমস্যা হতে পারে। সেটা হতে পারে যেকোন তথ্য বা স্মৃতি। চলমান সময়ের স্মৃতিগুলো মনে রাখতে যেটা আমদের কাজে লাগে তাকে বলা হয় ওয়ার্কিং মেমোরি। সাম্প্রতিক সময়ে ২০১৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায় যে মানসিক চাপ এই ওয়ার্কিং মেমোরিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একারণে মানুষের ভুলে যাবার অভ্যাস তৈরী হয়।

প্রতিকার

নিজেকে চাপ মুক্ত রাখার পাশাপাশি আরো কিছু কাজ করা যেতে পারে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে। সেই কাজগুলোকে হতে হবে মনোযোগ ধরে রাখার মত এবং একই সাথে ইন্টারেস্টিং। ক্রস ওয়ার্ড পাজল ভিত্তিক গেমস, সূডোকু, ক্রাফটস, ভিডিও গেমস খেলা বা পছন্দের বাদ্যযন্ত্র বাজানো ইত্যাদি কাজে নিজেকে ব্যাস্ত রাখা যেতে পারে। এতে মনোযোগের সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে কেটে যাবে।

 

 

রাগ বেড়ে যাওয়া

লম্বা সময় ঘরে বন্দি থাকার কারনে আপনার সহ্য ক্ষমতা কমে গেছে বলে মনে হচ্ছে? মেজাজ খুব অল্পতেই চড়ে যাচ্ছে? ভাববেন না কারণ আপনি একা নন, এ সমস্যায় অনেকেই ভুগছেন। গবেষণায় দেখা গেছে যে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি মানসিক চাপের কারণেও এটা হয়ে থাকে। অন্যান্য সমস্যার পাশাপাশি রাগ বেড়ে যাবার কারণে পরিচিত জন ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে সম্পর্কের অবনতি হবার আশংকা থাকে, যা মোটেই কাম্য না।

প্রতিকার

প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে মানসিক চাপ হচ্ছে এটাকে স্বীকার করে নেয়া এবং এ থেকে যাতে রাগ তৈরি হতে না পারে সেদিকে নজর দেয়া। প্রয়োজনে পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে দুরত্ব বজায় রেখে নিজেকে শান্ত হবার সময় দেয়া যেতে পারে। অথবা পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে সমস্যা গুলো নিয়ে কথা বলা যেতে পারে। এতে মন হাল্কা হবে। চাপ কমে যাবে।

মনকে রিল্যাক্স করতে লম্বা গভীর শ্বাস নিলে উপকার পাবেন। লম্বা করে শ্বাস নিন এবং প্রশ্বাস ত্যাগ করুন। খেয়াল রাখবেন যে আপনার প্রশ্বাস যেন নিঃশ্বাসের চাইতে দুই গুণ লম্বা হয়। সুন্দর একটি স্থানে আছেন, এটা কল্পনা করুন। এর আগে কোথাও বেড়াতে গিয়ে ভাল অনুভুতি পেয়েছেন, এরকম কোন জায়গার কথা ভাবলে ভাল হবে। এছাড়া শরীর চর্চাও এক্ষেত্রে আপনাকে ভাল ফল দিবে।

সুত্রঃ ওয়াশিংটন পোস্ট।

Comments
0Shares

Leave a Reply