করোনা সংকটঃ বাড়িতে থাকা সময়কে কিভাবে উপভোগ্য ও অর্থবহ করবেন?

Coronavirus (Covid 19) এর সংক্রমণ এখন একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। এই মরণঘাতি ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে মানুষ আজ ঘরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বড়দের অফিস বন্ধ, ছোটদের স্কুল বন্ধ। স্পোর্টস ইভেন্ট, কন্সার্ট, টুরিস্ট স্পট এমনকি রেস্টুরেন্টগুলোও থাকছে বন্ধ। এসবই করা হচ্ছে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। সবাই মোটামুটি লম্বা একটা সময়ের জন্য নিজেদের বাড়িতে থাকছেন।

আমাদের কেউই এরকম অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিল না। তাই হুট করে অনেকটা বাধ্য হয়ে বাসায় থাকাটা অনেকের ক্ষেত্রেই কিছু ছোট সমস্যা তৈরি করতে পারে। যেমন বিরক্ত লাগা, মন খারাপ লাগা, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। বিভিন্ন সংস্থার হিসেব অনুযায়ী কোয়ারেন্টিন থাকার কারণে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স তথা সাংসারিক বিবাদের পরিমান বেড়ে গেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

এই জরুরি সময়ে যাতে পরিবারের মধ্যে এই ধরণের কোন সমস্যা না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর রাখা দরকার। এসব সমস্যা এড়াতে একটা উপায় হতে পারে নিজেদেরকে গঠনমূলক কাজে ব্যাস্ত রাখা। সেই বিষয়ে কিছু ধারণা দিতেই আজকের ব্লগটা লেখা। এমন বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আজ বলব, যা আপনার কোয়ারেন্টিনে থাকা সময় কে শুধু ইন্টারেস্টিং করবে না বরঞ্চ এই কাজ গুলো গঠনমূলকও হবে।

১। পাজল (Puzzle) ভিত্তিক গেমস খেলুন

এই ধরনের খেলাগুলো আপনার মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখবে। এই খেলার সময় যথেস্ট পরিমান চিন্তা ভাবনা করতে হয়, তাই সময় কিভাবে কেটে যাবে বুঝতেই পারবেন না! তাছাড়া এটি পরিবারের সবাই কে নিয়ে অংশ নেয়ার মত একটি খেলা। বিভিন্ন খবরের কাগজে এই পাজল গুলো দেয়া থাকে। এছাড়া অনলাইনেও ফ্রি খেলতে পারবেন।

 

২। একটি ব্লগ শুরু করুন

লেখালেখি হতে পারে সময় পার করার অন্যতম সেরা উপায়। অভ্যাস নেই? সমস্যা কি, চেস্টা করার সময় তো এটাই! আপনার ব্লগটি হতে পারে করোনা ভাইরাস নিয়ে। অথবা আপনি আপনার পছন্দের যেকোন বিষয়েও লিখতে পারেন।

মজার ব্যাপার হল এজন্য আপনার একটি টাকাও খরচ করতে হবে না। WordPress, Blogger, Medium সহ এরকম অনেক চমৎকার প্ল্যাটফর্ম রয়েছে যা একদম ফ্রি।

 

৩। মিউজিক?

মিউজিক ভালবাসেন? হয়ত এক কালে শখ করে কিনেছিলেন একটি গিটার অথবা হারমোনিয়াম, তবলা? কিন্তু কাজের চাপে আর বসা হয় না সেটা নিয়ে? এখন একটা চমৎকার সময় আপনার লুকায়িত প্রতিভাবে বিকশিত করার। ভাল লাগা যন্ত্রকে নিয়ে নাড়া চাড়া করতেই দেখবেন অনেক সময় চলে গেছে। রেখে গেছে দারুন একটি আমেজ। তবে খেয়াল রাখবেন, তা যেন অন্যের বিরক্তির কারণ না হয়ে দাড়ায়।

 

৪। পুরাতন বন্ধু – বান্ধবীদের সাথে যোগাযোগ করুন

আমাদের তো কত বন্ধুই থাকে। ব্যাস্ততার কারণে এদের কয়জনের সাথে আমরা কথা বলি? হয়ত ফেসবুকের বন্ধু তালিকার এক কোনে পড়ে আছে, খবর নেয়া হয় না। ফোনবুকে নম্বর আছে, কল করার সময় হয় না। এখনি সময় পুরনো সম্পর্কগুলোকে ঝালিয়ে নেবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যাবহার করে তাদের সাথে কথা বলুন। দেখবেন কথা বলে, পুরনো স্মৃতিগুলো এক সাথে হাতড়ালে ভালই লাগবে।

 

৫। কবিতা লেখার চেস্টা করুন

এই চেস্টা করার ইচ্ছা অনেকেরই থাকে। কিন্তু কেমন হবে ইত্যাদি ভেবে অনেকেই আর সামনে আগান না। আমি বলব সফলতা ব্যার্থতার কথা এক পাশে সরিয়ে রাখুন। চেস্টা করুন, দেখবেন কিছু একটা দাড়িয়ে গেছে। অনেকেই ভেবে কুল পাবেন না কি নিয়ে লিখবেন। তাদের জন্য একটা সাজেশন। সামনেই আসছে মা দিবস। তার আগে মা কে নিয়ে একটা কিছু লিখে ফেলতে পারলে কেমন হয়?এটা মায়ের জন্য দারুন একটি উপহার হতে পারে।

 

৬। ম্যুভি দেখুন

সময় কাটানোর জন্য প্রিয় জনরার ম্যুভি থেকে ভাল আর কি হতে পারে? তবে শুরু করে দিন। তবে হ্যা, সে সমস্ত ম্যুভি আপনার ওয়াচ লিস্টে রাখবেন যেগুলো বেশ লম্বা। হয়ত সময়ের ব্যাস্ততায় এই ম্যুভি গুলো আপনার দেখা হয়ে উঠে নি। যেমন লর্ড অফ দ্য রিংস বা হবিট সিরিজ দেখে নিতে পারেন। এই ম্যুভি গুলোর এক্সটেন্ডেড কাট এডিশন একেকটা প্রায় ৩ ঘন্টা ব্যাপি। দারুন লাগবে। তবে ম্যুভি সিলেকশন এর সময় অবশ্যই আপনার সংগি বা পরিবারের অন্য সদস্যদের মতামতের গুরুত্ব দিতে হবে।

 

৭। বই পড়ুন

সময় কাটানোর আরেকটি চমৎকার উপায় হল বই। এক কাপ কফির সাথে একটা ভাল বই আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য এক জগতে। এক্ষেত্রেও যেসব বই বেশ বড় সেগুলোকে প্রাধান্য দিতে পারেন। পড়ে ফেলতে পারেন প্রিয় লেখকের কিছু উপন্যাস বা প্রিয় কবির কিছু মহাকাব্য, যার যেটা ভাল লাগে।

 

৮। পেইন্টিং করুন

যাদের এই শখ আছে তারা তো করবেনই। যাদের শখ নাই তাদেরও চেস্টা করায় কোন দোষ নাই। আঁকানো একটা দারুন ব্যাপার। আকার মাধ্যমে আপনি নিজের একটা জগৎ তৈরী করব ফেলতে পারেন। রং পেন্সিল নেই? তাতে কি? পেন্সিল অথবা কলম দিয়েই শুরু হোক না।

 

৯। মেডিটেশন করুন

সব সময়ে যে আপনাকে কোন কিছু উপভোগ করতে হবে এর কোন মানে নেই। নিজের আত্মন্নয়নের জন্যও কিছু কাজ করা যেতে পারে। মেডিটেশন তার মধ্যে একটা। কিভাবে মেডিটেশন করবেন তা জানতে ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে নিতে পারেন।

 

১০। নিজের শরিরের যত্ন নিন

আমাদের ব্যস্ত জীবন যেন আমাদের নিজেদের দিকে তাকাবার সময়ই দেয় না। এবার যেহেতু হাতে বেশ সময় পাচ্ছেন, তাই সেই ঘাটতি পুরণ করে নেবার এটা একটা ভাল সুযোগ। শারিরীক ব্যায়ামের একটা ভাল অভ্যাস করে ফেলতে পারেন। লম্বা সময় ঘরে বসে থাকার কারনে শরীরের প্রয়োজনীয় যে মুভমেন্ট সেটা হচ্ছে না। তাই নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যেই ব্যায়াম করা অনেকটাই দরকারী। এছাড়া নারীরা তাদের রূপচর্চা সংক্রান্ত কিছু কাজ করে নিতে পারেন। নিজেকে সুন্দর দেখলে মন মেজাজ এমনিতেই ভাল থাকবে, একথা বলাই বাহুল্য।

 

১১। ঘর বাড়ি গুছানো

ব্যাস্ততার কারণে অনেক সময় ঘরবাড়ি ভাল মত পরিস্কার ও গুছানো হয়ে উঠে না। এই লম্বা সময়ের একটা ছোট অংশ কাজে লাগিয়ে আপনার প্রিয় বাড়িটি গুছিয়ে আরো চমতকার রূপ দিতে পারেন। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে আপনার নিজের এবং অন্যদের যেমন ভাল লাগবে, তেমনি সবাই থাকতে পারবেন জীবাণু ও অন্যান্য সমস্যা থেকে নিরাপদ।

 

১২। ভিডিও গেমস খেলুন

ভিডিও গেমসের ব্যাপারে যাদের আসক্তি, তাদের এই কথা মনে করিয়ে দেবার কোন প্রয়োজন নেই, জানি। তবে যারা কখনো খেলেননি বা খেলার ইচ্ছা থাকলেও সময় হয় না, তাদের জন্য এটা হতে পারে এক রঙিন সময়। আপনার পছন্দের জনরার গেমস আপনাকে বিরক্তিকর সময় থেকে বাচাবে। সেই সাথে আপনার মস্তিষ্কও থাকবে ব্যাস্ত। তবে একটা বিষয় খেয়াল রাখা দরকার। আপনার গেমস নিয়ে ব্যাস্ততা যেন পরিবারের অন্য সদস্যদের নিঃসংগ না করে দেয়।

 

১৩। ইউটিউব ভিডিও তৈরী করুন

আপনি যেই হন না কেন, কোন না কোন বিষয়ে আপনি অন্যদের চাইতে ভাল ধারণা রাখেন। যেহেতু আপনি সেই বিষয়ে দক্ষ, সেহেতু আপনি সেই বিষয় অন্যদের শিখাতে পারবেন। এই বিষয়ের উপর তৈরী করে ফেলতে পারেন কিছু ইউটিউব ভিডিও। এতে আপনার সময়ও ভাল কাটবে, নিজের জানা শোনা গুলোও আরেকটু ঝালাই করে নেয়া হবে। কে কি ভাবল বা আপনাকে যথেষ্ট স্মার্ট দেখাল কিনা, এগুলো ছোট খাট ব্যাপারে ভাববেন না।

 

১৪। ভাবুন, বেশি ভাবা প্র‍্যাকটিস করুন

পড়াশোনা, চাকরি, সোশ্যাল মিডিয়া, ম্যুভি ইত্যাদির ভিড়ে আমরা যেন নিজেদেরকে নিয়ে গভীর চিন্তা করাই ভুলে গেছি। তাই কিছু সময়ের জন্য হলেও সমস্ত কাজ বাদ রেখে চিন্তা করুন। ভাবুন। নিজেকে, নিজের পরিবারকে, এবং নিজের সমাজকে নিয়ে ভাবুন।

 

১৫। পরিবারকে একান্ত সময় দিন

সব কাজ দুরে রেখে পরিবারের জন্য সময় বের করুন। তাদের সাথে ভালভাবে কথা বলুন। কারো কোন সমস্যা থাকলে সেটা বুঝার চেস্টা করুন। নিজেদের মধ্যে দুরত্ব কমিয়ে আনার এটা একটা মোক্ষম সুযোগ। বাবা, মা সাথে থাকলে সময় দিন। দুরে থাকলে নিয়মিত ফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে খোজ খবর নিন। আপনার সব থেকে আপনজন কিন্তু আপনার পরিবার।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

করোনা ভাইরাস (Covid 19) আক্রান্ত হলে কেমন অনুভুতি হয়? জেনে নিন সুস্থ হওয়া ৫ জনের অভিজ্ঞতা।
Previous post
ই পাসপোর্ট কি । ই পাসপোর্ট কিভাবে করবেন। ই পাসপোর্ট করার ফি ও নিয়ম
Next post
Reviewed by 46 People. - Rated: 4.0 / 5.0